
শাহরিয়ার খান নাফিজ, হবিগঞ্জ:
শিক্ষা ও গবেষণা কাজে ব্যবহারের জন্য নিঃশর্ত নিজের মৃতদেহ হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজে দান করেছেন নবীগঞ্জের মানবদরদি সাহসী যুবক লিটন দাশ তালুকদার। লিটন দাশের দুটি কিডনি নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় থেকে গতকাল ১৩ সেপ্টেম্বর রবিবার সকাল ১১টায় নবীগঞ্জ পৌরসভার শিবপাশায় নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি ছাত্রজীবনে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের আদর্শে অনুপ্রাণিত ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মৃত্যুর পরে তাঁর দেহটি না জ্বালিয়ে বা না পচিয়ে যদি মানবকল্যাণে ব্যবহার হয়, তাহলেই জীবনের কিছুটা সার্থক হবে। তাঁর দেহ ও বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ গবেষণা করে অনেক মেডিকেল শিক্ষার্থী বড় ডাক্তার হয়ে সমাজের চিকিৎসাসেবায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারবে। এতে মানবজাতি অনেক উপকৃত হতে পারে। তাই সামাজিক বিভিন্ন বাস্তবতাকে অতিক্রম করে এমন সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এটাই সম্ভবত হবিগঞ্জ জেলার কোনো ব্যক্তির মরণোত্তর দেহদান এবং হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজেরও প্রথম কোনো মরণোত্তর দেহপ্রাপ্তি। তাঁর পিতা মৃত দ্বিজেন্দ্র দাশ তালুকদার, মাতা রেখা রানী দাশ। তাঁর একমাত্র বড় ভাই দিপু চন্দ্র দাশ তালুকদার বাসদ নবীগঞ্জ উপজেলা কমিটির সদস্য। তিনি দ্রুত মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন বুঝতে পেরে গত ১৩ আগস্ট ২০২৬ খ্রি. তিনি একটি নোটারীকৃত ঘোষণাপত্রের মাধ্যমে তাঁর মৃতদেহ যেন হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যবহৃত হয়, এই মর্মে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজে ঘোষণাপত্রটি হস্তান্তর করেন। গতকাল সকালে লিটন দাশের মৃত্যুর খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. জাবেদ জিল্লুল বারি, এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সুপার্থ ভট্টাচার্য্য, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট প্রশান্ত চন্দ্র দেব, হিসাবরক্ষক সূর্য লাল রায়, ক্যাশিয়ার নারায়ণ পাল, লিটন দাশের বড় ভাই দিপু দাশ, বাসদ হবিগঞ্জ জেলা শাখার সদস্য সচিব শফিকুল ইসলাম ও অ্যাডভোকেট সবুজ দাশের দিনব্যাপী আন্তরিক প্রচেষ্টায় মৃতদেহ হস্তান্তরে জেলা প্রশাসনের অনুমতিসহ আইনি প্রক্রিয়া সম্পাদন করেন। আইনি প্রক্রিয়া শেষে গতকাল রাত ৮টা ৩০ মিনিটে লিটন দাশের বড় ভাই দিপু দাশ ও তাঁর আত্মীয়স্বজনরা মৃতদেহটি হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। মেডিকেল কলেজের পক্ষ থেকে এ সময় ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সসহ নবীগঞ্জে উপস্থিত ছিলেন এনাটমি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. সুপার্থ ভট্টাচার্য্য, প্রধান টেকনোলজিস্ট প্রশান্ত চন্দ্র দেব, হিসাবরক্ষক সূর্য লাল রায়, ক্যাশিয়ার নারায়ণ পাল। মৃতদেহ হস্তান্তরের পূর্বে বাসদ হবিগঞ্জ জেলা ও নবীগঞ্জ উপজেলার পক্ষ থেকে তাঁর কর্ম ও স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান করে লাল সালাম প্রদর্শন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাসদ নবীগঞ্জ উপজেলা শাখার আহ্বায়ক চৌধুরী ফয়সল সুয়েব, বাসদ হবিগঞ্জ জেলা শাখার সদস্য সচিব শফিকুল ইসলাম, বাসদ নবীগঞ্জ উপজেলা কমিটির সদস্য কাঞ্চন চক্রবর্ত্তী, দিপু চন্দ্র দাশ তালুকদার, তমাল ভট্টাচার্য, নরেন্দ্র পাল, কুমারেশ চক্রবর্তী, কংকন চক্রবর্তী, জয় চক্রবর্ত্তী প্রমুখ। শ্রদ্ধা নিবেদনকালে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গ বলেন, লিটন দাশের এমন পরোপকারী সাহসী সিদ্ধান্ত আমাদেরকেও মানবিক হওয়ার ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা জোগাবে। মানুষ মরে গিয়েও তাঁর চোখ, কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হৃদপিণ্ডসহ বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করে জীবিত মানুষের ব্যবহারে ভূমিকা রাখতে পারেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে তা অনেক সহজ এবং মানুষের সামর্থ্যের সীমায় চলে এসেছে। এসব ক্ষেত্রে সামাজিক বাধাবিপত্তি থাকলে সমাজের অগ্রসরমান চিন্তার ব্যক্তিবর্গকে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা দরকার। মেডিকেল কলেজের পক্ষ থেকে প্রধান টেকনোলজিস্ট প্রশান্ত চন্দ্র দেব বলেন, “আমাদের দেহ পচনশীল, কর্মটাই মূল। লিটন দাশ সেই মূল কাজটিই করে গেছেন। যে কারণে হবিগঞ্জ মেডিকেল কলেজ পরিবার আজীবন তাঁর মানবিক অবদানের কথা স্মরণ রাখবে।”
শাহরিয়ার খান নাফিজ 



















