
চট্টগ্রাম বিশেষ প্রতিনিধি : আহমদ রেজা
কর্ণফুলী নদীর ওপর কালুরঘাটে বহুল প্রত্যাশিত নতুন রেল-কাম-সড়ক সেতু নির্মাণ নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটছে না। একনেকের অনুমোদন, একাধিক সরকারি ঘোষণা ও নির্ধারিত সময়ে কাজ শুরুর প্রতিশ্রুতি থাকলেও প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজে এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। এ অবস্থায় আগামী তিন মাসের মধ্যে দৃশ্যমান নির্মাণকাজ শুরু এবং ২০২৯ সালের মধ্যে সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম। এ দাবিতে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছে সংগঠনটি।
রোববার (সেপ্টেম্বর ২০২৬) ভারপ্রাপ্ত চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরিচালক মনোয়ারা বেগমের কাছে স্মারকলিপিটি হস্তান্তর করা হয়। চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন ও মহাসচিব আবু তাহের চৌধুরী স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিতে প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রিতা নিরসনে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়েছে।
স্মারকলিপিতে বলা হয়, একনেকের অনুমোদনের প্রায় দুই বছর পরও কালুরঘাট নতুন সেতু প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণ ও মূল নির্মাণকাজে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। ফলে চট্টগ্রামবাসীর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগে ২০২৪ সালের ১৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতু এবং রেলপথ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছিলেন, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন কালুরঘাট সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হবে।
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর প্রকাশিত একটি সংবাদে কালুরঘাট সেতু নির্মাণ-সংক্রান্ত ফোকাল পার্সন ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী (সেতু) মো. গোলাম মোস্তফা জানিয়েছিলেন, ২০২৫ সালের মে-জুনের মধ্যে প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগ ও ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হবে। এরপর বিস্তারিত নকশা প্রণয়নে প্রায় এক বছর সময় লাগবে এবং টেন্ডার আহ্বানের পর সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হবে।
চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের দাবি, এসব ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতি নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়িত হয়নি। দেশের বিভিন্ন বড় প্রকল্প একনেকের অনুমোদনের পর তুলনামূলক স্বল্প সময়ে বাস্তবায়নের উদাহরণ রয়েছে উল্লেখ করে সংগঠনটি বলেছে, আন্তরিকতা, সদিচ্ছা ও যথাযথ তদারকি থাকলে কালুরঘাট সেতু প্রকল্পের কাজও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
স্মারকলিপিতে প্রকল্পটিকে অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা, বিলম্বের কারণ জনসম্মুখে প্রকাশ, সুনির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণা, আগামী তিন মাসের মধ্যে দৃশ্যমান কাজ শুরু এবং ২০২৯ সালের মধ্যে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, কালুরঘাটের নতুন রেল-কাম-সড়ক সেতুটি শুধু দক্ষিণ চট্টগ্রামের যোগাযোগব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়; চট্টগ্রাম বন্দর, শিল্পাঞ্চল, কক্সবাজারের রেল যোগাযোগ এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের সঙ্গেও এর গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও যোগাযোগগত সম্পর্ক রয়েছে। প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রিতায় নির্মাণব্যয় বৃদ্ধি, জনদুর্ভোগ ও যানজট বাড়ার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
স্মারকলিপি প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের ভাইস চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট শিল্পী শাহরিয়ার খালেদ, মহাসচিব আবু তাহের চৌধুরী, যুগ্ম-মহাসচিব মো. কামরুল ইসলাম, বিশিষ্ট রাজনীতিক মিতুল দাশ গুপ্ত, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডিজিএম একরাম হোসেন, সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় মহাসচিব জাফর ইকবাল, শিশুসাহিত্যিক ও কবি তসলিম খাঁ, বোয়ালখালী উপজেলা শাখার সভাপতি আক্তার হোসেন নিজামী, পরিবেশকর্মী মাসুদ রানা, সংস্কৃতিকর্মী জসিম উদ্দিন চৌধুরী, মানবাধিকারকর্মী রোজী চৌধুরী, সাংবাদিক আবছার উদ্দিন অলি, নারীনেত্রী আফরোজা সুলতানা পূর্ণিমা, তাহেরা শারমিন, সাবরিনা আফরোজা, লায়ন অলি আহমদ পিন্টু, সাংবাদিক ইলিয়াছ রিপন, জসিম উদ্দিন, এ কে আজাদ, সমাজসেবী মাঈনুদ্দিন, আইটি বিশেষজ্ঞ মিসেস আজমেরীসহ ফোরামের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।
‘সেতুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত নীরব হব না’
স্মারকলিপি প্রদান শেষে চট্টগ্রাম আদালত ভবন প্রাঙ্গণে আয়োজিত এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের নেতৃবৃন্দ বলেন, কালুরঘাট নতুন সেতু চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। এই দাবি কোনো আঞ্চলিক দাবি নয়; চট্টগ্রামের অর্থনীতি, বন্দর, শিল্প ও জাতীয় যোগাযোগব্যবস্থার স্বার্থে এটি একটি জাতীয় দাবি।
বক্তারা বলেন, চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরাম দীর্ঘদিন ধরে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কালুরঘাট নতুন সেতু বাস্তবায়নের দাবিতে আন্দোলন-সংগ্রাম করে আসছে। বিভিন্ন সময়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হলেও প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ শুরু না হওয়ায় চট্টগ্রামবাসী বারবার হতাশ হয়েছে।
চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার মনোয়ার হোসেন বলেন, “কালুরঘাট নতুন সেতুর স্বপ্ন বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত আমরা কোনো অবস্থাতেই নীরব হব না। আমাদের দাবি অরাজনৈতিক ও সামাজিক। চট্টগ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের জন্য গঠনমূলক ও শান্তিপূর্ণভাবে চট্টগ্রাম নাগরিক ফোরামের ব্যানারে চট্টগ্রামবাসী ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। আমাদের সচেতন প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে, যতদিন না এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।”
নেতৃবৃন্দ দ্রুত প্রকল্পের প্রশাসনিক জটিলতা নিরসন, ভূমি অধিগ্রহণ ও নির্মাণ-প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে দৃশ্যমান কাজ শুরুর জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।
প্রতিবেদকের নাম 



















